, শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২০

শুক্রবার

বিষয় :

প্রকাশ :  ২০১৮-০৮-১৫ ১৫:৫২:৫৮

ফেলে দেয়া জিনিসে গাছগাছালির অমূল্য বেড়ে ওঠা

লেখক: ঘরকন্যারা যখন চাষী হয়ে ওঠে তখন ঘরের জিনিষপত্রেও তার প্রভাব পড়ে। তা সে চাষাবাদ ছাদে, বারান্দায় বা ঘরের কোনে যেখানেই হোক না কেন। আমার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। ভাঙা প্রেমে খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি। কানা ভাঙা গ্লাস, চিড় খাওয়া সিরামিকের বাটি, বাড়তি মগ, হাতল ছাড়া কফি মগ, তরকারী ধোঁয়ার গামলা, ফ্লাওয়ার জগ, ঘর মুছবার ঢলঢলে বালতি, দোকানের আইসক্রীম কাপ, কফির ওয়ান টাইম গ্লাস, গাড়ির ধুলা ঝাড়বার পালকের ব্রাশ, এমন কি বাসার গাড়ির বদলানো পুরানো দুটো টায়ার, না কোন কিছুই আমার কাছ থেকে ঘরের বাইরে বের হতে পারেনি।

গৃহস্থালী কাজের কাঁচের এমন কিছু পাত্র যদি ভেঙ্গে চুরচুর না হয়ে যায়, তাহলে তাতে গাছ লাগানো কোন কঠিন কাজ নয়। সবচেয়ে আগে দেখতে হবে ভাঙ্গা কোথায়! যেমন ধরেন গ্লাস হলে, যদি কানায় ভাঙা থাকে তাহলে তার একদম নীচে সামান্য মাটির স্তর দিয়ে মানিপ্ল্যান্ট, সবুজ বাটারফ্লাই, পিস বাম্বু জাতীয় গাছ শিকড়সহ সোজা রেখে চারিদিকে পাথর শক্ত করে গ্লাসের মাঝ পর্যন্ত দিয়ে জল দিতে হবে। রোদ কম লাগবে এমন জায়গায় রাখতে হবে তাকে। জলের পরিমাণ খেয়াল করতে হবে। পাথর সাধারণত জল শুষে নেয়। তাই সপ্তাহে দুবার জলের পরিমাণ দেখে ভরে দিতে হবে।

সিরামিকের বাটিতে যদি কোথাও চিড় ধরে তাহলে তাতে মাটি এবং জল হয় তেমন গাছ বুনতে হবে। এর মাঝে পয়সা পানা, মানিপ্ল্যান্ট, সোর্ড লিলি, পিস বাম্বু, ড্রেসিনিয়াম সুন্দর বড় হবে। মাটিসহ গাছ বুনে জল দিয়ে মাটিটা ভরে রাখলে একদম সবুজ হয়ে পাতা ছাড়ে সিরামিকের পাত্রে। মাটির এবং সিরামিকের পাত্র গাছের বাসস্থানের জন্য সবচেয়ে উপকারী হয়ে থাকে, বাস্তবেও তাই দেখছি আমি। মাটির টব জল শুষে ভিজে থাকলেও শুকিয়ে যায় তাড়াতাড়ি। সিরামিক টব জল শুষে খুব ধীরে। সারাদিনই তাই সিরামিক টবের মাটি ভেজা থাকে। সিরামিক টব মাটির টব থেকেও সে কারণেই ঘরে বা অফিসে গাছ রাখবার বাসস্থান হিসেবে অনেক জনপ্রিয়।

ঘরে বাড়তি প্লাস্টিকের মগ যদি থাকে তাতে উপরে লেখা নামের সবগুলো গাছ বুনতে পারবেন। আমি অবশ্য একটা প্লাস্টিকের মগে আর একটা গামলায় কচুরী পানা রেখেছি। মাটি ছাড়া শুধুমাত্র জলেই তাদের বসবাস। গামলার কচুরী ফুলও ফুটিয়েছে সেদিন। আর বাদবাকী প্লাস্টিক মগে আমি মানিপ্ল্যান্ট রেখেছি। মাটিতে বুনেছি তাদের। ঘরে মানিপ্ল্যান্টের দীর্ঘ লতা বা পিস বাম্বুর নতুন নতুন পাতা পেতে হলে মাটিতে বুনতে হবে। শুধু মাত্র জল হলে তারা বেঁচে থাকলেও দীর্ঘদিনেও বড় হয় না। বরং গাছ বা লতার আগা সাদাটে সরু হয়ে আসে। বাথরুমে আমি ছোট ছোট দশ টাকার লাল মগে মাটিতে মানিপ্ল্যান্ট দিয়েছি। হাতল জানালার গ্রিলে গেঁথে দেয়ায় একদম সুন্দর করে গ্রিল ধরে উঠছে লতারা।

পিঠা বানানোর জন্য নারিকেল আনা হয়েছিল শীতে। নারিকেলের একদিকের খোড়া অক্ষত রেখে তাতে সামান্য মাটি আর জলে একটা পয়সা পানার শেকড় বুনে দিয়েছিলাম। এখন তাতে অনেকগুলো নতুন পাতা ছেড়েছে। নারিকেলের খোড়া ঠিক মতন মেঝেতে বসে না তাই একদিকে বড় একটা পাথড় দিয়ে সামঞ্জস্য এনেছি। ছোট্ট কানা ভাঙা ফ্লাওয়ার জগে ড্রেসিনিয়ার একটা আগা বুনেছি সেদিন। মাটিতে হওয়ায় ঠিক পাতা ছেড়েছে নতুন। কোন পাত্রে কী গাছ সুন্দর লাগবে তা ভাবার আগে, কোন পাত্রে কী গাছ ভালোভাবে বেঁচে থাকবে সেটা প্রথম খেয়ালে রাখতে হবে। যেমন বাতিল হয়ে যাওয়া গাড়ি ঝাড়বার পালকের ব্রাশটি সযত্নে এনে রেখে দিয়েছিলাম। বৈশাখে কুঞ্জলতার চারা বের হলে জড়িয়ে উঠবে তাই। ঠিক সময় মতন চারাগুলোর মাঝখানে গেথে দিয়েছিলাম ব্রাশটা। ব্যস ঝিরিঝিরি সবুজ কুঞ্জপাতায় ভরে গেছে বাদ হয়ে যাওয়া গাড়ির ব্রাশ।

দু বছর আগে বাসার গাড়ির পেছনের চাকা দুটো পরিবর্তন করা হয়েছিল। পুরোনো চাকা দুটো আমি দখল করেছিলাম। মাঝখানের ফাকা গোল জায়গায় মোটা পলিথিক বিছিয়ে তাতে মাটি আর জৈবসার দিয়ে ভরে রেখে দিয়েছিলাম দুই দিন। একটাতে কচু, চাইনীজ আলু আর ঘৃতকুমারী বুনে দিয়েছিলাম। তড়তড়িয়ে বেড়েছে সবাই। আরেকটা ছাদের দুটো শক্ত রেলিঙে মোটা গুনা দিয়ে উপরে বেঁধে ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম। তাতে নীল অপরাজিতার ছোট্ট চারার বাসস্থান করে দিয়েছিলাম। এখন সে আমার ছাদ থেকে আরেক ছাদ উপরে জলাধারের ছাদ ছু্ঁয়ে ফেলার সমান দীর্ঘ হয়েছে।

ঘরকন্যার চাষাবাদে ভালোবাসার প্রয়োজন বেশি। যত্ন আপণ গতিতেই চলে। গাছের চলন বুঝে গেলে তাকে আয়ত্তে আনা কোন বিষয় নয়। নগরে চাষাবাদ চলুক ভালোবাসার টানে, চাষাবাদ চলুক সবুজ সুন্দরে।

চাষী পরিবার, সুখী পরিবার।

আরো সংবাদ